বিদ্যাসাগরের মা
ইমন জুবায়ের

 

        ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনে চারটে বিষয় লক্ষ করে মুগ্ধ হয়ে যাই এবং সেই চারটে বিষয় বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকেও বিবেচনা করে দেখতে প্রস্তাব করি। (ক) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের অবদান; বাংলা গদ্যে বিরামচিহ্ন তাঁরই অবদান (খ) তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ। যে কারণে কোনওদিক থেকেই নিজেকে ব্রিটিশদের চেয়ে ছোট ভাবতেন না বিদ্যাসাগর। (গ) নারীর প্রতি নারীসুলভ সহানুভূতি। যে কারণে রক্ষণশীল একটি সমাজে বিধবা বিবাহের প্রচলনের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করেননি। (ঘ) এবং তাঁর গভীর মাতৃভক্তি। মায়ের ডাকেই এক ঝড়ো রাত্রিতে বিক্ষুব্দ দামোদর (পশ্চিমবঙ্গের একটি নদী) পেরিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। আজ এসব বিশ্লেষন করে আমার মনে হয় যে- বিদ্যাসাগর কেবলই একজন বিশিষ্ট বাঙালিই নন-বিশ্বের প্রাতস্মরণীয় ব্যাক্তিদের নামের তালিকায় তাঁর নামটিও অনেকই উচুঁতে এবং আমার এও মনে হয় যে- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মানবিক মানসিক গঠনের পিছনে ছিল তাঁর মা ভগবতী দেবীর গভীর প্রভাব।

        এমন তো হতেই পারে। যিশু খ্রিস্টর মা মেরি ছিলেন সে যুগের তুলনায় অত্যন্ত প্রখর চেতনাসম্পন্ন এক নারী । বেগম রোকেয়ার কিছু কিছু বক্তব্য আমাদের বিস্মিত করে না কি? অনুমান করি-তৎকালীন ফিলিস্তিনীয় সমাজের বিদ্যমান বেদনাদায়ক অসঙ্গতিগুলি মেরির চোখ এড়ায়নি। একদিকে, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর ধর্মান্ধ ইহুদিবাদের পীড়ন; মানে, ধর্ম-ট্যাক্স চাপিয়ে দেওয়া, রুটিমাংস তাদেরই ভোগে যাওয়া, নারীর ভূমিকা ক্রমেই সঙ্কুচিত করে ফেলা; অন্যদিকে বৈদেশিক রোমান শাসনের অবিবেচনাপ্রসুত অন্যায় করারোপ। এহেন বিষময় পরিবেশ থেকে মেরি কি এক গভীর সামাজিক পরিবর্তন চাইছিলেন আব্রাহামিয় ধর্মের কাঠামোটি না ভেঙ্গেই ? আমি তাইই অনুমান করি। পরিবর্তন বা বিপ্লবকে কার্যকর করতে পুত্র সন্তান কামনা করেছিলেন? যে সন্তান বিপ্লবের আগুনে নিজেকে উৎসর্গ করবে? আমার তো তাইই মনে হয়। আমরা আজ মেরিপুত্রের বিপ্লবের করুন পরিনতির কথা জানি। নিজের চোখের সামনে বিপ্লবী সন্তানের মৃত্যু দেখেছেন মেরি। অসম্ভব কষ্ট হলেও মেনে নিয়েছেন। আমার বক্তব্যটি বুঝতে হলে মেল গিবসনের
The Passion of the Christ ছবিটা আরেকবার দেখুন। এবং গোড়া থেকেই চোখ রাখুন মেরির ওপর। মেল গিবসন মহৎ বলেই বুঝতে পেরেছিলেন পুত্রের জীবনের ওপর মা মেরির ভূমিকা ছিল কী ব্যাপক।

        ছোটদের জন্য বিদ্যাসাগরের চমৎকার একটি জীবনী লিখেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। বইটি পড়তে পড়তে মা মেরির কথা মনে পড়ে গেল আমার। পুত্রের ওপর মা মেরির ছিল গভীর প্রভাব। বিদ্যাসাগরের মায়েরও তাই। বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী। শঙ্খ ঘোষের লেখা পড়ে জানতে পারি: ভারি ভালো মানুষ ছিলেন ভগবতী দেবী। পাড়া গাঁর অভাবী লোকের খোঁজ খবর নিয়মিত নিতেন, নিজের পাতের ভাত অন্যকে খাওয়াতেন, মাত্তর একশ টাকার জন্য কোনও মেয়ের বিয়ের ঠেকে রয়েছে-ধার করে হলেও টাকাটা যোগার করে দিতেন। স্বভাবতই দুর্দশাগ্রস্থ দুঃস্থ নারীরা ভগবতী দেবীকে ঘিরে থাকত। ভগবতী দেবীর পুত্র সন্তানটি খুব কাছ থেকে মায়ের কল্যাণকর ভূমিকাটি দেখছিল। একদিন মায়ের আর্শীবাদ নিয়ে কলকাতা রওনা হল ছেলে । তারপর? তারপর কলকাতায় বিদ্যাসাগর কি করেছেন এখনও সেসব কথা লোকের মুখে মুখে ফেরে। তখন আমি নারীর প্রতি নারীসুলভ সহানুভূতির কথা উল্লেখ করেছিলাম। ওই আশ্চর্য জাদু বাল্য বয়েসেই অসংখ্যবার লক্ষ করেছিলেন বিদ্যাসাগর। এখন আমি জানি মূখ্যত কার প্রেরণায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েও বাংলায় নারীমুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিলেন বিদ্যাসাগর। ফরাসী সম্রাট
Napoleon Bonaparte একবার বলেছিলেন: The future destiny of the child is always the work of the mother.কথাটা অসত্য নয়। যে কারণে বিদ্যাসাগরের কর্মে আমরা ভগবতী দেবীকে পাই। যিশুর কর্মে তেম্নি মেরিকে। মায়ের কাছে পৌঁছনোর জন্য বিদ্যাসাগরের ঝড়ো রাত্রিতে বিক্ষুব্দ দামোদর নদী পেরোনোর কথা বলছিলাম না? অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে অসত্য মনে করেন। আমি করি না। কেননা, শিষ্য তো প্রাণপ্রিয় প্রণম্য গুরুর জন্য প্রাণকে তুচ্ছ করতেই পারে। মায়ের ডাকে কি একাত্তরে সে রকম আত্তাহূতির ঘটনা ঘটেনি পূর্ব বাংলায়? যিশু কি তাঁর মায়ের আদেশে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন নি?

[পেছনের পাতা]
প্রাচ্যের আন্তর্জাল পত্রিকা অভিবাস www.japanbangladesh.com