স্বাধীনতা পদক: শিবনারায়ণ দাশ ও আমাদের দায়ভার

২০১০ সালের স্বাধীনতা পদকের জন্য সচিবলায়ের কর্মকর্তাদের কাছে সম্প্রতি মনোনয়ন আহবান  করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে অসামান্য অবদান রাখায় স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনয়ন দেবেন, জাতি এটাই প্রত্যাশা করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষের সরকারের আমলে জাতীয় মর্যাদাপূর্ণ এ পদকের জন্য যথোপযুক্ত (ডিজার্ভিং) ব্যক্তিরা মনোনয়ন পাচ্ছেন কিনা তা এখন দেখার বিষয়। স্বাধীনতা পদকের মনোনয়নের জন্য ডিজার্ভিং এমন ব্যক্তিদের নামের তালিকা নিয়ে অন্যবারের মতো এবারো নানামুখী লবিয়িং হবে, সে কথা বলাই বাহুল্য। তবে এসব লবিয়িংয়ে আর কারো নাম থাকলেও শিবনারায়ণ দাশের নামে থাকবে না, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। শিবনারায়ণকে নতুন প্রজন্ম চেনে না আর পুরনো প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। অথচ যে পতাকাটি হাতে নিয়ে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল সে পতাকাটির প্রথম ডিজাইনার ছিলেন তিনি। যদিও ইতিহাস বিকৃতির ধারাবাহিকতায় পতাকা ডিজাইনের এ সত্যটুকুও অবিকৃত থাকেনি। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে যারা ইতিহাস রচনা কিংবা বিকৃত করার সুযোগ পেয়েছেন তাদের কারো কাছেই শিবনারায়ণ প্রিয়ভাজন ছিলেন না। স্বাধীনতার পর তিনি সম্ভোগের কাতারে না গিয়ে প্রতিবাদের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সুতরাং সুবিধাভোগীদের দ্বারা রচিত কিংবা বিকৃত ইতিহাস তার প্রতি সদয় না হওয়াই স্বাভাবিক। সে কারণেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন স্বাধীনতার পতাকার রূপকার শিবনারায়ণ দাশ। আমরা জীবদ্দশায় কাউকে মূল্যায়ন করতে পারি না বা তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে পারি না। শিবনারায়ণ তার প্রমাণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক দেয়া হয়। প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এবং কৃতিত্ব নিয়েও অতীতে অনেকে এসব পদক পেয়েছেন। অথচ আমাদের জাতিসত্তার প্রথম পতাকাটির ডিজাইনার পদক তো দূরের কথা, কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কখনো পাননি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত তার প্রতিবাদী চরিত্রটি তিনি বিসর্জন দিতে পারেননি বলে তিনি কোনো সরকার বা প্রশাসনের সুনজরে আসতে পারেননি। দেশের গণমানুষের চূড়ান্ত মুক্তির জন্য অসুস্থ শরীর নিয়েও আজো যিনি নিরন্তর ভেবে চলেন আর সংগ্রামের পথ খোঁজেন, সেই শিবনারায়ণ তার আপসহীনতার জন্য নিজের দলের (জাসদ) নেতাদের কাছেও অপ্রিয়ভাজন হয়েছেন। সুতরাং সুধীমহলে তিনি রয়ে গেছেন অপাঙক্তেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক বর্তমান সরকারের আমলে যদি দলীয়বৃত্তের বাইরে এসে তাকে স্বীকৃতি না দেয়া হয় তবে তার দায়ভার আমাদের বইতে হবে জন্মান্তরে। এবারের স্বাধীনতা পদক মনোনয়নে আমাদের প্রথম পতাকার ডিজাইনার শিবনারায়ণ দাশের নাম বিবেচনা করা তাই সময়ের দাবি। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্টমহলের সুদৃষ্টি আমাদের কাম্য।  তাকে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দেয়া কিংবা না দেয়ার দায়ভার জাতির এবং সরকারের। কিন্তু যারা তার দীর্ঘদিনের সহগামী তাদের দায়ভার অসুস্থ শিবনারায়ণ দাশের পাশে এসে দাঁড়ানো। তার সহযোদ্ধাদের সবাই অক্ষম, পলায়নবাদী কিংবা বিশ্বাসভ্রষ্ট নন। তাদের অনেকেই আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার পাশে দাঁড়িয়ে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তাকে সামাজিক নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনার দায়ভার সেই সব সহগামীরা এড়াতে পারেন না। 

 আহমেদ শরীফ শুভ, দৈনিকি আমাদের সময়, নভেম্বর ১৭, ২০০৯

(টীকাঃ জাপান প্রবাসীরা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছেনে এই মহান ব্যক্তির। ২০০৮ সালের টোকিও বৈশাখী মেলায় শিবনারায়ণ দাশ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।)
[পেছনের পাতা]
প্রাচ্যের আন্তর্জাল পত্রিকা অভিবাস www.japanbangladesh.com